ট্রাম্পের শুল্কনীতি

প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ওপর ঘোষিত শুল্কহার বেশি

তিন মাসের স্থগিতাদেশ শেষ হওয়ার আগেই ৭ জুলাই বাংলাদেশের ওপর ৩৫ শতাংশ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপ করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে এ হার ২০ শতাংশ।

তিন মাসের স্থগিতাদেশ শেষ হওয়ার আগেই ৭ জুলাই বাংলাদেশের ওপর ৩৫ শতাংশ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপ করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে এ হার ২০ শতাংশ। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর দাবি দেশটির ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ হতে পারে ২০ শতাংশের কম। চীনের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের রেসিপ্রোকাল শুল্ক আগস্ট থেকে ৩৪ শতাংশ হারে আরোপ হতে পারে। তবে চীন ব্রিকসের সদস্য হওয়ায় এ শুল্কহার আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় শুল্কহার অনেক বেশি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্য রফতানিকারকদের উদ্বেগ বাড়ছে। তারা বলছেন, শুল্ক পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায় তা না জানা পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না।

অর্থমূল্য বিবেচনায় বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হওয়া মোট পণ্যের ৮৭ শতাংশই তৈরি পোশাক। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হওয়া বাংলাদেশের প্রধান পণ্যগুলোর মধ্যে তৈরি পোশাক ছাড়া রয়েছে হেডগিয়ার, জুতা, অন্যান্য বস্ত্রপণ্য, পালক এবং পালক দ্বারা তৈরি সামগ্রী, চামড়াজাত পণ্য, মাছ, শস্যদানা, প্লাস্টিক পণ্য, আসবাব প্রভৃতি। এসব খাতসংশ্লিষ্টরা এখন বড় উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। তবে স্বভাবতই দেশের পোশাক শিল্পোদ্যোক্তাদের দুশ্চিন্তা অন্যদের চেয়ে বেশি।

পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা আগে থেকেই বলে আসছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশ চারটি—চীন, ভিয়েতনাম, ভারত ও পাকিস্তান। বাংলাদেশের ওপর পাল্টা শুল্কের প্রভাব নির্ভর করছে প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপর কী হারে শুল্ক আরোপ হচ্ছে তার ওপর। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মূল দুই প্রতিযোগী ভিয়েতনাম ও ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত শুল্কহার অনেক বেশি। ১ আগস্ট থেকে সেই হার কার্যকর হলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প প্রতিযোগীদের সক্ষমতার তুলনায় অবধারিতভাবে অনেক পিছিয়ে পড়বে।

পোশাক রফতানিকারকরা বলছেন, বাংলাদেশের চেয়ে ভারত ও ভিয়েতনামের ওপর আরোপিত শুল্কহার যদি কম হয়, তাহলে বাংলাদেশ অবশ্যই সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদা অনুযায়ী ভিয়েতনাম, ভারত বা পাকিস্তান কতটা পণ্য সরবরাহ করতে পারবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাকের বাজারে সবচেয়ে বড় অংশ সরবরাহ করে চীন। নতুন ঘোষিত শুল্কহারে চীনের রফতানি অনেক কমে যাবে। এরপর রয়েছে ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ ও ভারত। শুল্কের প্রভাবে চীনের পোশাক রফতানি যতটা কমতে পারে তা বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনাম মিলেও সরবরাহ করতে পারবে কিনা সে বিষয়ে সংশয় রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সুবিধাজনক অবস্থান ধরে রাখা নিয়ে আশাবাদী থাকতে চাইছেন বাংলাদেশের পোশাক রফতানিকারকরা।

নিট পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পণ্যের চাহিদা থাকলেও ক্রেতারা রফতানিকারক দেশের ওপরে শুল্কের বোঝা চাপানোর চেষ্টা করবে, যা অনৈতিক। দিন শেষে ভুক্তভোগী হবেন ভোক্তা। আর মূল্য কমানোর চাপ বাড়বে রফতানিকারকের ওপর। ক্রেতাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াস্বরূপ দেখা যাচ্ছে, পোশাক রফতানিকারকদের চলমান ক্রয়াদেশ থেকে জাহাজীকরণ হওয়ার অপেক্ষায় থাকা চালান স্থগিত করা হয়েছে।’

পোশাকসহ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারসংশ্লিষ্ট সব রফতানি খাতের উদ্যোক্তারাই উদ্বেগে রয়েছেন উল্লেখ করে বিকেএমইএর পাশাপাশি রফতানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশেরও (ইএবি) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘আশার জায়গাটি হলো শুল্কের কারণে চীন থেকে অনেক ক্রয়াদেশ সরে আসতে পারে। আর সেগুলো সরবরাহ করার সক্ষমতা বিবেচনায় বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানেই আছে। কিন্তু উদ্বেগ কাটছে না, কারণ দিন শেষে কী হতে যাচ্ছে তা এখনো পরিষ্কার নয়। পরিস্থিতি কেমন হতে যাচ্ছে সেটা বুঝতে এ মাসের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলসের (ওটিইএক্সএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে গোটা বিশ্ব থেকে যুক্তরাষ্ট্র পোশাক আমদানি করেছে ৭ হাজার ৯২৫ কোটি ৭৫ লাখ ৭০ হাজার ডলারের। এর ২০ দশমিক ৮২ শতাংশ সরবরাহ করেছে চীন। ভিয়েতনাম সরবরাহ করেছে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ। বাংলাদেশ সরবরাহ করেছে ৯ দশমিক ২৬ শতাংশ। ভারত সরবরাহ করেছে ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশ—যেমন ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের ওপর কী হারে শুল্ক আরোপ হচ্ছে তা এখনো পরিষ্কার নয়। যদি দেখা যায় এ দেশগুলোর ওপর শুল্কহার অপেক্ষাকৃত কম, তাহলে বাংলাদেশ একটি গুরুতর প্রতিযোগিতামূলক অসুবিধার মুখোমুখি হবে। এর ফলে সরবরাহ চেইনভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ জটিল হয়ে পড়বে এবং বিদেশী ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল হবে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এ অনিশ্চয়তা যে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকরা খরচ কমাতে এবং ঝুঁকি এড়াতে সহজেই বিকল্প সরবরাহকারীদের দিকে ঝুঁকতে পারেন। বাংলাদেশের রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি পোশাক শিল্পনির্ভর, এ একক খাতনির্ভরতা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।’

জানা গেছে, পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে যারা ওভেন পোশাক রফতানি করেন তারা ট্রাম্পের শুল্ক কাঠামোর চেয়েও চুক্তিতে থাকা বাণিজ্যিক বিধিমালা নিয়ে বেশি শঙ্কিত। কারণ চুক্তির রুলস অব অরিজিনে মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার পেতে পণ্যে ৪০ শতাংশ দেশীয় মূল্য সংযোজন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ শর্তের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের রফতানিতে চীনা কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ, যা মূলত চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবেলায় ওয়াশিংটনের বৃহত্তর কৌশলের অংশ। রুলস অব অরিজিনের শর্ত বাংলাদেশের ওভেন পোশাক রফতানিকারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘আমরা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত স্থানীয় মূল্য সংযোজন সক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারব বলে মনে করছি। আর ভারত, ভিয়েতনাম কারো ওপরই শুল্কহার এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এখন পর্যন্ত একটি দেশের সঙ্গেও চুক্তি হয়নি। ভিয়েতনাম সরকারও ২০ শতাংশ শুল্ক নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। আমাদের উদ্বেগ আমরা জানিয়েছি। ভালো বিষয় হলো সরকার আমাদের সঙ্গে আলোচনা করতে শুরু করেছে। ভিয়েতনাম বা ভারতের চেয়ে ২ বা ৩ শতাংশ বেশি শুল্ক আরোপ হলে বাংলাদেশের জন্য “‍ওকে”। কিন্তু পার্থক্য ৩ বা ৫ শতাংশের বেশি হলে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা সরে যাবে। তবে সব ব্যবসা চলে যাবে এমনটা নয়। যুক্তরাষ্ট্রে মোট ৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি থেকে যদি ৩ বিলিয়ন ডলারও কমে যায়, তাতেও বাংলাদেশের অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। যে কারখানাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর বেশি নির্ভরশীল তারা বিপদে পড়বে।’

পোশাক শিল্প মালিকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ মূলত কম দামের পোশাকপণ্য বেশি প্রস্তুত করে। ভিয়েতনাম যদি যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি শুল্ক সুবিধাপ্রাপ্ত হয়, তাহলে দেশটিতে ক্রয়াদেশ মূলত আসবে চীন থেকে। কারণ চীন বেশি দামের পোশাকপণ্য বেশি উৎপাদন করে। ফলে বাংলাদেশের সক্ষমতার যে ক্ষেত্র অর্থাৎ কম দামি পোশাক, সেটি হাতছাড়া হওয়ার কারণ নেই। সমস্যা হবে যদি বাংলাদেশের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা দেশের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান থাকে।

শিল্প মালিকরা বলছেন, ভিয়েতনাম ছাড়া বাকি তিনটি দেশ—চীন, ভারত ও পাকিস্তানের ওপর আরোপিত শুল্কহার যদি বাংলাদেশের কাছাকাছি হয়, তাহলে খুব বেশি শঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। কারণ ভিয়েতনাম ও চীন থেকে স্থানান্তরিত ক্রয়াদেশের পর খুব বেশি জায়গা থাকবে না। ফলে বাংলাদেশের ক্রয়াদেশ সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে বলে ধারণা করছেন পোশাক রফতানিকারকরা।

ভিয়েতনাম বাংলাদেশের উদ্বেগের কারণ নয় জানিয়ে পোশাক রফতানিকারকরা বলছেন, দেশটি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ ক্রয়াদেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারবে। কিন্তু ভারত ও পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলে তারা বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ ক্রয়াদেশের ওপর প্রভাব ফেলার ক্ষেত্র তৈরি করবে। এতে বাংলাদেশী পোশাকের দাম হয়তো কমে যাবে, কিন্তু পরিমাণের প্রবৃদ্ধি খুব কমবে না বলে আশা করছেন তারা। এখন ভারতের শুল্কহার বাংলাদেশের চেয়ে ৪ বা ৫ শতাংশ কম। পাকিস্তান সমান সমান আর চীনের শুল্ক বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। শুল্ক আরোপের পরও যদি এ অবস্থান অব্যাহত থাকে তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী পণ্যের প্রবৃদ্ধিও অব্যাহত থাকবে।

জানা গেছে, গতকালই সংশ্লিষ্ট রফতানিকারক, বাণিজ্য সংগঠনের নেতারা ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সভার নোটিস দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। আজ বেলা ৩টায় অনুষ্ঠিতব্য ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ এগ্রিমেন্ট’ শীর্ষক ওই সভার আমন্ত্রণ পাওয়াদের মধ্যে রয়েছেন বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা, অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা।

আরও